KOLKATA WEATHER
সম্পাদকের কলমে

আদিবাসী শ্রমিকদের ঘরে ফিরিয়ে, জঙ্গলমহলের গর্ব এসআই মানিক চন্দ্র হাঁসদা

বিশেষ প্রতিবেদন, সঞ্জীব পাল : ১৯৫০ সালে রামনগরে সাঁওতাল পুলিশ কর্মীদের নিয়ে স্থাপিত হয়েছিল “কোলকাতা খেরওয়াল মাঃ মঁড়ে গাঁওতা”( পুজো কমিটি)।পরবর্তীকালে পুলিশের আলিপুর বডিগার্ড লাইনে,তিথি মেনে জাহের গাড়ে শুভ সূচনা হয়েছিল এই সাঁওতালি সংগঠনের।
বিগত বছর ধরে সিঁঙ্গুর ও কলকাতা সংলগ্নস্থানে কৃষিকার্যের জন্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে আদিবাসী অধ্যুষিত বাঁকুড়া,পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বিভিন্ন জেলা,এমনকি ঝাড়খন্ড থেকেও আসেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রচুর মানুষ ।

লকডাউনের চতুর্থ সপ্তাহে সেই সকল পরিযায়ী শ্রমিকদের আটকে পড়া ও তাদের চরম দুর্ভোগের খবর ক্লাসমেট পঙ্কজ কুমার বাস্কের সূত্রে এসে পৌঁছায় “কলকাতা মাঃ মঁড়ে গাঁওতা”(পুজো কমিটি)-র সম্পাদক ও কলকাতা পুলিশের সহআধিকারিক মানিক চন্দ্র হাঁসদার কানে। উক্ত পুজো কমিটির সভাপতি কালিচরন মুর্মুর সঙ্গে পরামর্শ করে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন হুগলির সিঙ্গুরে আটকে পরা শ্রমিকদের দিকে। সেখানে অনাহারে আটকে পড়া প্রায় ৬০০ আদিবাসী পরিযায়ী শ্রমিকদের খাওয়ানোর দায়িত্ব তুলে নেন নিজেদের কাঁধে। “কোলকাতা খেরওয়াল মাঃ মঁড়ে গাঁওতা”( পুজো কমিটি) ও বিভিন্ন জায়গা থেকে শুভাকাঙ্ক্ষী গুনিজনের আর্থিক সাহায্য নিয়ে ওই সকল শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান তিনি।

নিজস্ব চিত্র

পরে লকডাউন চলাকালীনই, স্থানীয় থানার পুলিশি ব্যবস্থাপনায় , অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে় ওই সকল শ্রমিকদের নিরাপদে নিজেদের বাড়িতে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করেন তিনিই । নাওয়া-খাওয়া ভুলে লকডাইনের মাঝে, ওই মহৎ কাজে জান লড়ানো ব্যক্তিটি হলেন, উত্তর কলকাতার চিৎপুর থানার সহআধিকারিক শ্রী মানিকচন্দ্র হাঁসদা। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ওই আধিকারিক আজ ঘরে ফেরা সেই সকল আদিবাসী পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারের চোখে “দেবদূত”সম।

বাঁকুড়া জেলার গঙ্গাজলঘাটি থানার জামবনি গ্রামে ১৯৭৪ সালে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহন করেন মানিক চন্দ্র হাঁসদা। ছয় ভাইবোনের সংসারে প্রচন্ড অভাবের মধ্যেও নিজের পড়াশোনা বজায় রেখে , গ্রামের চয়নপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে শুরু করে প্রথমে উখরাডিহি নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়, তারপরে বিহার জুড়িয়া হাইস্কুল ও ঝাড়গ্রামের এ্যড়গোঁদ নিত্যানন্দ বিদ্যায়তনে পড়াশোনা করেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে টিচার ট্রেনিংএর জন্যে ভর্তি হয়েছিলেন বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজে। কিন্তু হঠাৎ ডাক আসে পুলিশে চাকরির। ১৯৯৩ সালে কলেজ ছেড়ে, কলকাতা পুলিশের সিপাই পদে যোগ দেন । পরবর্তীকালে পুলিশি পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০৪ সালে এএসআই তারপর ২০১২ সালে এসআই পদে । বিভিন্ন সময়ে তার মানবিক কাজ ও আদর্শের জন্যে মানিক বাবুকে স্বল্প সময়ের মধ্যে “কোলকাতা মাঃ মঁড়ে গাঁওতা”(পুজো কমিটি)- কমিটির সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।সেই থেকে তিনি সম্পাদক রূপে গুরু দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

আরো পড়ুন: নেশায় পক্ষীপ্রেমী চিত্রগ্রাহক,পেশায় কলকাতার পুলিশ আধিকারিক

এই শহরে পুলিশ বাহিনীতে অসংখ্য সাঁওতালি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ কর্মরত ছিলেন এবং আছেন। যেকোনো বিপদেআপদে, তাঁদের সকলের পাশে দাঁড়াতে, সকল আদিবাসী পুলিশ কর্মীদের সঙ্গে যোগসুত্র বজায় রেখে চলেছে এই আদিবাসী সংগঠনটি।
এই সংগঠনের উদ্দ্যোগেই প্রতি বছর বৈশাখী পুর্ণিমাতে আলিপুর বডিগার্ড লাইনে অনুষ্ঠিত হয় আদিবাসী দেবতা “মারাং বুরু”র পুজানুষ্ঠান,যেখানে প্রত্যেক বছর উপস্থিত থাকেন স্বয়ং কলকাতা পুলিশের নগর পাল ।
প্রসঙ্গতঃ আদিবাসী অনাথ শিশুদের জন্যে, বিখ্যাত আদিবাসী গায়ক নরেন হাঁসদা পুরুলিয়াতে গড়ে তুলেছেন একটি আবাসিক স্কুল, সেই স্কুলেও নিয়মিত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আসছে কলকাতার এই আদিবাসী সংগঠনটি।
চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর মানিকবাবু স্কুল গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি আবার তার শাল পিঁয়ালে ঘেরা গ্রামেই ফেরত যেতে চান। পিছিয়ে পড়া আদিবাসী গ্রামগুলিতে তাঁদের সাঁওতাল সম্প্রদায়ের পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত করার ব্রততে ব্রততী তিনি। সেই ব্রত পালনের উদ্দেশ্যে, আদিবাসী সমাজের দেবদূততুল্য, কলকাতা পুলিশের এস.আই মানিক চন্দ্র হাঁসদা তার গ্রামে আদিবাসী ছেলে-মেয়েদের জন্যে গড়ে তুলতে চান একটি বিদ্যালয়।

মোবাইলে খবরের নোটিফিকেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন - Whatsapp , Facebook Group

আমাদের খবর পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন - Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close
Close