KOLKATA WEATHER
সম্পাদকের কলমে

পুলিশ দিবস ও কিছু কথা

আগামী ১ সেপ্টেম্বর পুলিশ দিবস। রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এই দিনটিকে উৎসর্গ করেছেন পুলিশের জন্য, তাদের কাজের স্বীকৃতি হিসাবে। পাশাপাশি করোনা-যুদ্ধে মিডিয়ার অবদানও তুলে ধরেছেন। ‘পুলিশ-দিবস’ কে সম্মান জানিয়ে ‘পুলিশ নিউজ’ ও ‘ইন্দো-বাংলা’ এই বিশেষ প্রতিবেদন।
সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী সেনা। তাদের হাতেই দেশের নিরাপত্তার ভার।ঘুমহীন চোখ, রাজস্থানের মরু-ঝড় কিংবা হাজার হাজার মিটার উচ্চতায় বয়ে আসা তীব্র তুষার ঝড়েও অচঞ্চল থেকে তার রক্ষা করে চলে দেশের সীমা, যাতে কোন বহি:শত্রু দেশের শান্তি ও নিরাপত্তায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে। তারা মৃত্যুহীন প্রাণ, কর্তব্য ও দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসায় স্নাত – সীমান্তের প্রহরী তারা।
আর সীমান্তের কাঁটা তারের বেড়া পেরিয়ে যদি দেশের ভিতরে তাকাই, দেখবো সেখানেও জাগ্রত আর এক সেনা। কোথাও খাকি পোশাক, কোথাও বা সাদা পোশাকে। যাদের অতন্দ্র প্রহরায় নিরুপদ্রব গ্রাম ও শহর। সেনা যখন জল-স্থল-অন্তরীক্ষকে ঢেকে রাখে তার সুরক্ষার পরশে, পুলিশের গতি-পথ তখন নগরের সীমা ছাড়িয়ে বাংলার অলিতে-গলিতে, রাতের অন্ধকারে হাইওয়ে, কিংবা বাঘ-কুমীরে ভরা সুন্দরবনের কোন গহীন গ্রামে।
পুলিশ নিয়ে দুটি প্রবাদ সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ।‘ আর দ্বিতীয় প্রবাদটি হল- ‘পুলিশ তুমি যতই মারো, মাইনে তোমার সাতশো বারো।‘ এই প্রবাদদুটির উৎস অনুসন্ধান করলে আমরা দেখতে পাই, একদিকে পুলিশের উপর তীব্র ভয় আর অন্যদিকে তাচ্ছিল্য। সেখান থেকেই এই প্রবাদগুলোর যাত্রা শুরু। এর নেপথ্য কারণটিও সকলের জানা।
আসলে,পুলিশ সম্পর্কে ভালো কথা বলার মানুষ খুবই কম ছি্ল।‌ এখনো যে এই অবস্থার ব্যপক পরিবর্তন হয়েছে তাও নয়।এমনকি আমাদের মিডিয়া জগতেও পুলিশের আসন ‘শত্রু’ পক্ষে। খবর না ঘটলে মিডিয়া যায় কোথায়? ‘রাজ্যটা একেবারে শান্ত হয়ে গেল!খুন-রাহাজানি-ধর্ষণ তো দূরের কথা একটা ছিঁচকে চুরি পর্যন্ত নেই!হায়রে! আর যেগুলো চাই অথচ চাই না, সেগুলো ঘটতে থাকলেই মিডিয়াও ‘গেল গেল’ রব তুলবে। সব্বাইকে ছেড়ে, হাত স্যানিটাইজ করে মিডিয়া তখন পুলিশের পিছনেই পরে থাকবে। কাগজে-কাগজে, পর্দার বুকে তখন শুধুই পুলিশের অপদার্থতার ছবি।অন্যদিকে, পুলিশের উপর রাজনীতির কারবারীদের পরোক্ষ চাপ। পুলিশ তখন যায় কোথায়?’শ্যাম রাখি, না কূল রাখি’ অবস্থা। না যায় সব কথা সম্মুখে বলা, কিংবা চোখ বুজে আইনের পথে হেটে চলা। এ যেন, এক অদ্ভুত অসহায়তা। উভয়-সঙ্কট, যেন এক চক্রব্যুহ।বের হয়ে আসার পথ বড্ড চেনা, অথচ কতো কঠিন।
বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কাছে অনেকসময় পুলিশ হল সংগঠিত গুন্ডাবাহিনী আর রাষ্ট্রের কাছে পুলিশ হল তার ক্ষমতার চাবিকাঠি। যখন যে ক্ষমতায় বসবে, পুলিশের কাজ হল তার ‘সবরকম সুরক্ষার’ দায়িত্ব বিনা প্রশ্নে পালন করা। আর জনগনের কাছে পুলিশের ভূমিকা ঠিক কী? সেটা জনগন বোঝেন, কিন্তু তাদের বুঝতে দেওয়া হয় না।কারণটা সেই একই।একশ্রেণির সরকার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মন ও মুখ এর ব্যবধান, যা ক্রমশ: পুলিশ ও জনগনের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েই যাচ্ছে।
পুলিশ আমাদের শত্রুপক্ষ, না মিত্রপক্ষ, না শুধুই আইনের রক্ষাকর্তা, না কি এই সমাজের সব অসহায়তার ত্রাতা, না কি মানুষের বন্ধু, কিংবা মানবতার বন্ধু- এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে, পুলিশের স্বপক্ষে বা বিপক্ষে বলার মতো উপযুক্ত যুক্তিও আছে। ভুক্তভোগী মানুষও জানেন, এই পুলিশ কখনো ত্রাতা, কখনও বা ভাগ্য-বিধাতা।কিন্তু এই জানাটা যে ‘একমাত্র ও শেষ জানা’ ছিল না, করোনা পরিস্থিতিতে তা বুঝতে পেরেছেন এই বাংলার মানুষ। করোনা চিনিয়ে দিয়েছে বাংলার পুলিশ বাহিনীকে। সাদা পোশাকের কলকাতা পুলিশ কিংবা খাকি পোশাকে রাজ্য পুলিশ – সবাই এখন সৈনিক।সীমান্তে নয়, এই বাংলার রাজপথে-গলিপথে, কড়া পোশাকের আড়াল ছেড়ে এক মানবিক রূপে। করোনা পরিস্থিতি চিনিয়ে দিয়েছে, চেনা পুলিশের এই অচেনা রূপটা। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী তাই সঠিক সময়ে ঘোষণা করেছেন, পুলিশ দিবসের কথা। করোনা-যুদ্ধে, মানুষের জীবন রক্ষার যারা দায়িত্ব নিয়েছেন, সেই চিকিৎসকদের পাশাপাশি পুলিশ কর্মীরা দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন।কখনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে, কখনো লকডাউনে বন্দী শহর ও গ্রামের অসহায় মানুষের পাশে বন্ধু হিসাবে। চেনা পুলিশের এই অচেনা মুখ নাগরিকদের বিষ্মিত করলেও তাদের কাছে খুব একটা নতুন লাগেনি। কারণ এমনটাই মানুষ আশা করেছিল।আশা করে।

আরও পড়ুন: টোলপ্লাজা ভাঙচুরে গ্রেফতারের দাবি

সম্মুখ সারিতে থেকে লড়াই করছে রাজ্যের পুলিশ-বাহিনী। মৃত্যু আসছে, ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে সংসার, পৃথিবী, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র তারা ছাড়ছে না। এই হল আমাদের পুলিশ বাহিনীর নতুন রূপ। মুখ্যমন্ত্রী পুলিশের এই মুখকে সম্মান জানাতে, প্রেরণা যোগাতে ‘পুলিশ দিবস’ এর ঘোষণা করেছেন।
মিডিয়ার পক্ষ থেকে আমরাও একে স্বাগত জানাই। তথাপি কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। উত্তর হয়তো থাকে না, কিংবা জানা উত্তর তোলা থাকে ভবিষ্যতের জন্য। তবু প্রশ্ন করে যেতেই হয়, উত্তরের আশা না করে।
অঞ্জন চৌধুরীর ‘শত্রু’ ছবিতে আমরা পুলিশের দুই রূপ দেখেছিলাম-ভালো ও খারাপ।সব পেশাতেই তা আছে। কিন্তু পুলিশ একটা বাহিনী।এখানে ব্যাক্তিগত দোষ অনেকসময় বাহিনীতে সংক্রামিত হতে পারে। তাই,পুলিশ কাদের জন্য কিংবা কার জন্য, এই কথাটা নতুন করে ভাবতে হবে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে।পুলিশ কি মানুষের রক্ষাকর্তা, সরকারের রক্ষাকর্তা, আইনের রক্ষাকর্তা, না মানবতার রক্ষাকর্তা? ভাবতে হবে। আইন তৈরি করেন যারা, তাদের ভাবতে হবে আইন মানুষের জন্য আর সেই আইনকে দেশের মতোই রক্ষা করবেন সীমানার ভিতরের প্রহরীরা। আর যে বা যারা সেই আইন কে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করবে, পুলিশ যেন তাদের চিনে নেয়,আইনের বন্ধনে বন্দী করে। মনে রাখতে হবে, পুলিশ কোন নাম নয়, পুলিশ কোন সাধারণ চাকুরে নয়, পুলিশ এক পবিত্র কর্মে লিপ্ত সেনানী। পুলিশ দিবস, পুলিশের সেই মুখকেই স্বীকৃতি দিচ্ছে, যে মুখ মানবতার রক্ষাকারী, আইনের পালনকারী।

মোবাইলে খবরের নোটিফিকেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন - Whatsapp , Facebook Group

আমাদের খবর পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন - Whatsapp
Close
Close