KOLKATA WEATHER
সম্পাদকের কলমে

সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অজগ্রামের সাহিত্যপ্রেমী ছেলে আজ কলকাতা পুলিশের আধিকারিক

বিশেষ প্রতিবেদন,সঞ্জীব পাল : লকডাউনের চতুর্থ সপ্তাহের এক সকালে ফুলবাগান অঞ্চলে সমস্ত দোকানবাজার বন্ধের মধ্যে একটি ছোট্ট দোকান খোলার অপরাধে একটি ছেলেকে ফুলবাগান থানায় ধরে নিয়ে আসে পুলিশ। ছেলেটি থানায় এসে এক আধিকারিককে প্রশ্ন করেছিল “আমাকে লকডাউন ভেঙে দোকান খোলার অপরাধে থানায় ধরে নিয়ে এলেন,কিন্তু আমি যদি দোকান না খুলি, আমার সংসারের চারটি মানুষকে খাওয়াবে কে?” এর উত্তর দিয়েছিলেন এক আধিকারিক। সন্ধেবেলা থানা থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেই চমকে উঠেছিল ওই দোকানি । সকালে থানায় যে আধিকারিককে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল, তিনিই ছেলেটির বাড়িতে চাল,ডাল ও বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে গেছেন। এই ঘটনার কথা পরে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পরেছিল, মানবিকতার নিদর্শন হিসেবে কলকাতা শহর জুড়ে ধন্যি ধন্যি পরে যায় ওই পুলিশ আধিকারিকের নামে।
সেদিন দোকানির করা একটি ছোট্ট প্রশ্নই গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল ফুলবাগান থানার অতিরিক্ত ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক কালীচরন মুর্মু-কে। এরপরেই তিনি থানার ওসি-র সহায়তায় ওই অঞ্চলে নেমে পড়েন সাহায্যের হাত নিয়ে। ফুলবাগান থানার বিভিন্ন অঞ্চলে লকডাউন পীড়িতদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন জরুরি সামগ্রী। এই মহান কাজে সমানভাবে তিনি সঙ্গে পেয়েছেন ফুলবাগান থানার ওসি করুনা শঙ্কর সিং ও অন্যান্য পুলিশ কর্মীদেরও। পুলিশ নিউজকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন তার মনের কথা।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ কালীচরন মুর্মু জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৬৬ সালে বাঁকুড়া জেলার রায়পুর থানার অন্তর্গত ফুটিবেড়িয়া নামে এক অঁজগ্রামে। কলকাতার পোস্ট অফিসে সামান্য মাইনের চাকুরে ছিলেন তার বাবা। চার ভাইবোনের সংসারে খুবই অভাব অনটনে মধ্যেই বড় হওয়া। কালীবাবু পড়াশোনা শুরু করেন গ্রামের অদূরের এক প্রাইমারি স্কুলে। এরপর হোস্টেলে থেকে ক্লাস সেভেন অবধি পড়েন বাঁকুড়ার সারেঙ্গা থানার ডুমুরতোর বিদ্যালয়ে। সেখানে পড়া শেষ করে চলে আসেন কলকাতার বেলেঘাটাতে বাবার কাছে । কলকাতায় এসে ভর্তি হন লিকলিন্স হাইস্কুলে। ১৯৭৬ -৭৭ সালে নকশাল আমলে কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন কাজ তাঁকে আকর্ষিত করেছিল পুলিশ হতে। তখন থেকেই মনের মধ্যে স্বপ্ন জাগে পুলিশ হয়ে মূলত মানুষের সেবা করার ইচ্ছা।

নিজস্ব চিত্র

এরপরই ১৯৮৭ সালে সুযোগ আসে পুলিশের পরীক্ষায় বসার । কৃতকার্য হয়ে ট্রেনিং এর পরে ১৯৮৮ সালে কলকাতা পুলিশের পঞ্চম ব্যাটেলিয়ানের সিপাহি রূপে যোগ দেন। ১৯৯৭ সালে আবার পরীক্ষা দিয়ে উপসহ আধিকারিকের পদ লাভ করেন। এএসআই পদে যোগ দেন দক্ষিণ কলকাতার লেক থানাতে। ভাগ্যক্রমে সেই সময় তিনি বেশ কিছু উচ্চপদস্থ আধিকারিকের সান্নিধ্য লাভ করেন ও পুলিশের কাজকর্মের বিভিন্ন ধরনের বিষয়ে তাঁদের থেকে শিক্ষা লাভ করেন তিনি। সাব-ইন্সপেক্টর হওয়ার জন্যে ২০০৩ সালে আবার তিনি পুলিশের পরীক্ষায় বসেন। এবং ২০০৪ সালে তিনি সাব-ইন্সপেক্টর পদ লাভ করেন। ২০১৮ সালে তার পদোন্নতি হয় ইন্সপেক্টর পদে। বর্তমানে তিনি ফুলবাগান থানার অতিরিক্ত ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। তিনি মনে করেন, যে কোনও সাধারণ মানুষকে,যে কোনও ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা করার আদর্শ জায়গাই হচ্ছে পুলিশ থানা। গত ২০১৯ সালে ৫ই জানুয়ারিতে ব্রেন টিউমারে হঠাৎ স্ত্রী বিয়োগ হ্য় কালিবাবুর। তার দুই পুত্রকন্যাই বর্তমানে উচ্চ শিক্ষায় রত। পুলিশরুপী সাহিত্যপ্রেমী এই মানুষটি স্কুল জীবনেই, শুরু করেছিলেন স্কুলের লিটিল মাগ্যাজিনে নিয়মিত প্রবন্ধ লেখা। পুলিশে চাকরি করাকালীনও বজায় রেখেছেন লেখার কাজ ।এছাড়াও সাঁওতালি অলচিকি লিপিকে সরকারি ভাষারূপে স্বীকৃতি দেওয়ার আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে যোগদান করেছিলেন । অবসর সময়ে সাহিত্য চর্চা বজায় রেখে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জন্যে অলচিকি লিপিতে নিয়মিত লিখে চলেছেন প্রবন্ধ ও নাট্য রচনা। ইতিমধ্যেই তার রচিত দুটি বই অলচিকি লিপিতে প্রকাশিত হয়েছে । প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে একটি সাঁওতালি ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা নাম “ভারত আয়রিন কনখাহন” ( দ্য ইনওসেন্স সন্স অফ ইন্ডিয়া), দ্বিতীয় বইটি মাদক বর্জনের ওপর লেখা , বইটির নাম “কৈদ অপয়া”(অপরাধ কার) । এছাড়াও আরও সাতটি নাটক তিনি লিখলেও, এখনও পয়সার অভাবে তা আর প্রকাশিত হয়নি। কারন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জন্যে অলচিকি লিপিতে বই প্রকাশের প্রকাশকের বড়ই অভাব এই শহরে। সারা দেশে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ নাট্যানুষ্ঠানেই তার রচিত নাটক দীর্ঘদিন ধরেই মঞ্চস্থ হয়ে আসছে। প্রতি বছর বৈশাখী পুর্নিমার দিনে ২০৫০ থেকে আলিপুর বডিগার্ড লাইনে প্রচলিত আছে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের দেবতা মারাং গুরুর পুজো । সেখানেও মুখ্য অতিথি পুলিশ কমিশনারের উপস্থিতিতে ওই অনুষ্ঠানের সংগঠকেদের ভূমিকায় থাকেন তিনি ।এছাড়াও তার বর্তমান বাসস্থান কলকাতার বাঁশদ্রোনিতে “সিধু কানু ডহর গাঁওতা” নামে একটি ক্লাবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত তিনি । এই ক্লাবের মাধ্যমে কলকাতায় বসবাসকারী চাকুরিজীবি সাঁওতালী সম্প্রদায়কে একত্রিত করে বিভিন্ন সাঁওতালি ও স্থানীয় অনুষ্ঠান পালন করে, শহুরে ভিড়ে সাঁওতালি কালচারকে এখনও হারিয়ে যেতে দেননি কালিবাবু।

আরো পড়ুন: ৫ টি চার চাকার গাড়ি উদ্ধার জামুড়িয়া পুলিশের

তার একটাই স্বপ্ন, রির্টায়ড করার পরে আবার তিনি পাকাপাকি গ্রামে ফিরে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের শিক্ষার জন্যে কিছু করে যেতে চান । গ্রামে তার অংশ থেকে বাবার একটি জমি দান করে সেখানে সাঁওতালি যুবসমাজের জন্যে একটি লাইব্রেরি করতে চান। আদিবাসী উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন কর্মসুচি ও সাহায্য প্রকল্প নিলেও , সেগুলো সঠিক ভাবে পিছিয়ে পরা গ্রামের সাঁওতালি সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে পুরোপুরি পৌঁছায় না বলে আক্ষেপের একটা সুর শোনা গেল তার গলাতে। কিন্তু পিছিয়ে পড়া সাঁওতালি আদিবাসী সম্প্রদায়ের এক অজগ্রাম থেকে উঠে আসা ইনস্পেক্টর কালিচরন মুর্মু আজ আমাদের দেশের পিছিয়ে পড়া জনজাতির এক জ্বলন্ত প্রতীক ও আর্দশ, যে কোনো মানুষই তার প্রবল ইচ্ছেশক্তি আর মনের জোরে সব কিছুই করতে পারে, সেটাই প্রমান করেছেন সাহিত্যপ্রেমী ফুলবাগান থানার অতিরিক্ত ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শ্রী কালীচরন মুর্মু।

মোবাইলে খবরের নোটিফিকেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন - Whatsapp , Facebook Group

আমাদের খবর পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন - Whatsapp
Close
Close