KOLKATA WEATHER
কলকাতাকলকাতা পুলিশদক্ষিণবঙ্গসম্পাদকের কলমে

নেশায় পক্ষীপ্রেমী চিত্রগ্রাহক,পেশায় কলকাতার পুলিশ আধিকারিক

বিশেষ প্রতিবেদন,সঞ্জীব পাল: ভিড়, ধুলো ও গাড়ির ধোঁয়ার মাঝে শ্যামবাজার পাঁচমাথা মোড়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে সদাব্যস্ত কলকাতা পুলিশের এক ট্র্যাফিক আধিকারিক। লকডাউনে শুনশান পাঁচমাথা মোড়ের নেতাজি মূর্তির ওপর হঠাৎ উড়ে আসা,নাম না জানা কোন পাখি বসলে, সচরাচর তার নজর সেদিকে গেলে, তার হাত যেন নিশপিশ করে ওঠে, হাতের আঙ্গুল খুঁজে বেড়ায় তার সাধের নিকন ডি-৭০০০ ক্যামেরার বোতামটিকে। কারণ, সে যে একজন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারও, বন্য পাখিদের ছবি তোলার অদম্য নেশা তার মনে ও প্রাণে। তিনি পেশায় শ্যামবাজার ট্র্যাফিক গার্ডের অতিরিক্ত ভারপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক সৌমিক সেনগুপ্ত।
বহরমপুরের মধুপুরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্রী সৌমিক। বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে। ছোটবেলা থেকেই ছবি তোলার নেশা। চিড়িয়াখানায় গেলেই এক অজানা আকর্ষণে অপলক দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন রংবেরঙের পাখির খাঁচার। অনেক কষ্টে পয়সা জমিয়ে কিনে ফেলেছিলেন নিকন ডি৯০ এসএলআর ক্যামেরাটি। মুর্শিদাবাদ বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজে গ্র্যাজুয়েশান কমপ্লিট করেই,সৌমিক ১৯৯৬ সালে চাকরি পান কলকাতা পুলিশে। এক বছর বাদে ট্রেনিং শেষে কলকাতায় পুলিশের সার্জেন্ট পদে যোগ দেন তিনি। রুজি রোজগার ও ছবি তোলার খরচের জোগান, এই দুই টানাপোড়েনে আজ পেশায় তিনি পুলিশ আধিকারিক। বিখ্যাত বিদেশি চিত্রগ্রাহক স্টিভ পেরি, এলেন মারফি এবং রেমন্ড বারলো-র একনিস্ট ভক্ত হলেও, বিখ্যাত ভারতীয় চিত্রগ্রাহক সুধীর শিবরাম, রাজ দাগে, অমিত রানে ও রোথিকা রামাস্বামীর তোলা ছবি অনুপ্রেরনা জুগিয়েছে তাঁকে। পেশাগত দিক থেকে সারাদিন গাড়ির ভিড়, কেস, রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করলেও, পাখির ছবি তোলাটাই তার মুখ্য ভালবাসা । কাজে ছুটি পেলেই ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়া। দৈনন্দিন জীবনে ঘোর সংসারি তিনি, একমাত্র মেয়ে সন্তানটি অঙ্কন বিদ্যায় পারদর্শী, তুলির টানে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে বিভিন্ন শিল্পকলার ছবি।

কর্মস্থলে পাওয়া ছুটিগুলি তিনি ব্যয় করেন ঘুরে ঘুরে পাখির ছবি তুলে।কাছাকাছি কোথাও কোনও বিদেশি পাখি আসার খবর পেলেই তিনি যাযাবরের মতো বেরিয়ে পড়েন ক্যামেরা কাঁধে। উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে গাছের ডালে ডালে তার সন্ধানি চোখ খুঁজে বেড়ায় শুধুই পাখি আর পাখি। “উঠিতে বসিতে বাপান্ত”, অর্থাৎ বাড়িতে এই কারণে কম গঞ্জনা শুনতে হয়না এই পক্ষীপ্রেমী পুলিশ আধিকারিকটিকে। সৌমিকের ভাষায়,”ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে যখন পাখিগুলিকে দেখি, তখন তাঁদের রং রূপ আমার মনে এক মাদকের মতো অদম্য বুনো নেশা জাগায়, রক্তে ওঠে এক অজানা খুশির আলোড়ন, যা ভাষায় বর্ণনাতীত এবং যতক্ষণ না আমি সেই সুন্দর পাখিটিকে ক্যামেরাবন্দী করছি, ততক্ষন আমি সারা শরীরে এক অজানা আলোড়ন অনুভব করি আমি “। শিল্পীদের নিজস্ব অনুভব হয়তো এমনই হয়। তার তোলা ছবি যেন জীবন্ত, মনে হয় এক্ষুনি যেন ডেকে উঠবে ছবির পাখিটি।

আরো পড়ুন: সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অজগ্রামের সাহিত্যপ্রেমী ছেলে আজ কলকাতা পুলিশের আধিকারিক

ইতিমধ্যেই দুএকটি পত্রপত্রিকায় তার তোলা ছবি প্রকাশিত হয়ে প্রশংসিত হয়েছে এবং স্থানীয় স্তরে বিভিন্ন ছবি প্রদর্শনীতে তাঁর তোলা ছবি প্রদর্শিত হলেও, দুঃখের বিষয়,এখনো সুযোগ আসেনি জাতীয়স্তরের কোনো ছবি প্রদর্শনীতে। পাখিদের ছবি তোলায় অসীম প্রতিভাশালী তিনি, কিন্তু তার এই প্রতিভাকে সর্বসমক্ষে তুলে ধরার মতো সুযোগ এখনো আসেনি তার জীবনে। হয়তো সবার অলখ্যেই থেকে যাবে তার এই অসীম প্রতিভা।তাই বলে কিন্তু তার মনে বিন্দুমাত্রও আক্ষেপ নেই। তিনি সারা জীবন পক্ষীপ্রেমী রূপেই তাঁদের ছবি ক্যামেরাবন্দী করেই,তাদের রূপ ও রঙের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চান,কারণ সেটাতেই নাকি তার সর্বসুখ। সত্যিই তিনি যেন এক পুলিশরুপী যথার্থ শিল্পী।

মোবাইলে খবরের নোটিফিকেশন পেতে এখানে ক্লিক করুন - Whatsapp , Facebook Group

আমাদের খবর পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন - Whatsapp
Close
Close